একজন অতি সাধারণ সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে আমি গুন্ডা দমন আইনকে স্বাগত জানাই। সমাজে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে একই সঙ্গে আমার মনে হয়, শুধু শাস্তি দিয়ে গুন্ডামি বা অপরাধপ্রবণতার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। অপরাধ দমন যেমন জরুরি, তেমনই অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎসগুলিকে চিহ্নিত করাও জরুরি।
আমাদের সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, নেশা, রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা অপরাধী চক্রের প্রলোভনে ধীরে ধীরে অপরাধজগতে ঢুকে পড়েন। প্রথমে হয়তো ছোটখাটো দাদাগিরি, তোলাবাজি বা মারামারি; পরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁদের জীবিকা ও পরিচয়ের অংশ। একবার এই চক্রে ঢুকে পড়লে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথও অনেক সময় তাঁদের সামনে খোলা থাকে না।
তাই আমার প্রস্তাব, গুন্ডা দমন আইনের পাশাপাশি সমাজের বিশিষ্ট নাগরিক, শিল্পপতি, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, আইনজীবী এবং প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ে একটি ‘অপরাধ প্রতিরোধ ও সামাজিক পুনঃসংযোগ সংস্থান’ গড়ে তোলা যেতে পারে। এটিকে নিছক পুনর্বাসন প্রকল্প হিসেবে না দেখে ‘অপরাধ থেকে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ’ হিসেবে দেখা উচিত।
ধরা যাক, কোনও যুবক স্থানীয়ভাবে গুন্ডামির সঙ্গে যুক্ত। তাকে শুধু গ্রেফতার করে জেলে পাঠানোর পাশাপাশি, আইনগত প্রক্রিয়া মেনে, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও আগ্রহ যাচাই করে যদি কারিগরি প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বিং, রাঁধুনি, নিরাপত্তাকর্মী, ডেলিভারি পরিষেবা কিংবা ছোট ব্যবসার প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে তার সামনে বৈধ উপার্জনের একটি বিকল্প তৈরি হবে। একজন মানুষ যদি সম্মানজনকভাবে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারেন, তাহলে অপরাধী গোষ্ঠীর কাছ থেকে সামান্য টাকার বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার আকর্ষণ অনেকটাই কমতে পারে।
একইভাবে, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একটি ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনও ব্যক্তি তার সাজা সম্পূর্ণ করার পর যদি সত্যিই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাহলে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। এতে অবশ্যই ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন সর্বাগ্রে থাকবে।
এখানে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—গুন্ডাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রশ্রয় বন্ধ করা। কারণ অপরাধী যতই শক্তিশালী হোক, যদি সে জানে যে আইন তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে এবং কোনও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব তাকে রক্ষা করবে না, তাহলে অপরাধের পরিবেশ অনেকটাই দুর্বল হবে। একই সঙ্গে যারা কিশোর বা তরুণ বয়সে অপরাধী গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকছে, তাদের জন্য স্কুল, ক্লাব ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় খেলাধুলা, কারিগরি শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আমার বিশ্বাস, কঠোর আইন এবং মানবিক সুযোগ—এই দুটির সমন্বয়েই কার্যকর গুন্ডা দমন সম্ভব। যারা গুরুতর অপরাধ করে, তাদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। কিন্তু যে মানুষটি অপরাধের জগৎ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তাকে যদি আমরা কোনও পথই না দেখাই, তাহলে সে আবার পুরনো পরিবেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। অতএব, আমার বিনীত প্রস্তাব—গুন্ডা দমন আইনকে শুধু ‘শাস্তির আইন’ হিসেবে না দেখে তাকে একটি বৃহত্তর অপরাধ প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান, সামাজিক দায়িত্ব ও পুনঃসংযোগের নীতির সঙ্গে যুক্ত করা হোক। সমাজের সুধীজনেরা যদি এগিয়ে আসেন, শিল্পমহল কর্মসংস্থানের দরজা খোলেন এবং সরকার প্রশিক্ষণ ও নজরদারির একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করে, তাহলে বহু সম্ভাবনাময় জীবন অপরাধের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
শেষ কথা একটাই—অপরাধীর অপরাধকে প্রশ্রয় নয়, কিন্তু মানুষটির পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেও অস্বীকার নয়। সমাজকে নিরাপদ করতে হলে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে; আর যে মানুষটি সত্যিই বদলাতে চায়, তাকে বৈধ জীবনের একটি দরজাও খুলে দিতে হবে। কঠোরতা অপরাধ দমন করবে, আর সুযোগ হয়তো ভবিষ্যতের অপরাধী তৈরি হওয়াই বন্ধ করবে।
No comments:
Post a Comment